প্রচ্ছদ > মতামত > রাজনীতি ও দূর্নীতি প্রসঙ্গ- অধ্যাপক আবু সামা মিঞা (ঠান্ডু)

রাজনীতি ও দূর্নীতি প্রসঙ্গ- অধ্যাপক আবু সামা মিঞা (ঠান্ডু)

৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্দোলন, সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের স্বাধীনতার ঘোষনায় বাঙ্গালী জাতিগত উত্থান ঘটে এবং ২৬শে মার্চে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ি এবং স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জন করি। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তানী শাসক ও শোষক গোষ্ঠির কবল থেকে মুক্তি লাভ হলেও স্বাধীনতার ৪৭ বছরে আমরা ইস্পিত লক্ষ্যে উপনিত হতে পারি নাই। প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ ও লোকবল থাকা স্বত্ত্বেও আমরা সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ মুকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছি।

জাতীয় মতানৈক্য, কোন্দল ও ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষায় আমরা ব্যস্ত। তাই আমাদের রাজনীতিতে গুনগত পরিবর্তন আসে নাই। আমরা স্বাধীনতার চেতনায় উদ্ধুদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ হতে পারি নাই।

বিগত কয়েক দশক ধরে আমাদের দেশ দূর্নীতির অভিযোগে বিপুল সমালোচিত হয়ে আসছে। শুধু কথায় কথায় স্বাধীনতার চেতনা, বাস্তবে স্বাধীনতার চেতনাকে ধূম্রজালে আবদ্ধ করে আদর্শ, নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে দুরে ঠেলে দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তির মাধ্যমে একটি অনাদর্শিক সমাজ গঠনে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে দূর্নীতি পরায়ন মানুষ এখন আর সমাজে অসম্মানিত নয় এবং দূর্নীতিকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবনতাও দিন দিন লোপ পাচ্ছে। দূর্নীতিবাজরা সত্যকে মিথ্যা, মিথ্যাকে সত্য, ভালকে মন্দ এবং মন্দকে ভাল বলে চালিয়ে যাচ্ছে। দূর্নীতির জন্য শাস্তির অপ্রতুলতা ও সামাজিক নিন্দা করার প্রবনতা হ্রাস পাওয়ায় আমাদের দেশে দূর্নীতি প্রায় অলিখিত বৈধতার পর্যায়ে এসে দাড়িয়েছে। দেশে নানা ধরনের দূর্নীতি ভয়াবহ রূপ ধারন করেছে। ফলে জাতির অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির সকল প্রচেষ্টাই ব্যহত হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার দূর্নীতির অন্যতম নিয়ামক। প্রশাসনের বিভিন্ন স্থরে অবৈধ অস্তক্ষেপ, দলীয় করন এবং নিজেদের সীমাহীন লোভ লালসার কারনে অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে। রাজনীতিবিদরা তাদের নিজেদের স্বার্থে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও দূর্নীতিবাজদের আশ্রয় প্রশয় দিয়ে থাকে। এর ফলে সমাজে দূর্নীতি সংক্রামক ব্যাধির ন্যায় ছড়িয়ে পড়ে। রাজনীতিবিদদের লোপ লালসা, অসততার সুযোগ নিয়ে জন প্রশাসনের সামান্য পিয়ন থেকে শুরু করে উচ্চ পদস্থ আমলা পর্যন্ত দূর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। এতে গোটা রাষ্ট্র যন্ত্র দূর্বল ও অচল হয়ে পড়ে।

দেশের সামগ্রীক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্থ হয়। আমাদের দেশে অনেক সম্পদ আছে, শুধু একটি জিনিষের অভাব তা হলো দেশাত্মবোধ। আর এই দেশাত্মবোধের অভাবে দূর্নীতি অনাচার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা যদি দেশাত্মবোধ ও জাতীয়ত-বোধ নিজের মধ্যে লালন করি এবং পরিকল্পিতভাবে নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম করে নিজেদের জীবিকা অর্জন করতে পারি তাহলে দেশ সমৃদ্ধিশালী হবে এবং একটি সুন্দর ও শক্তিশালী জাতি গঠনের পথে এগিয়ে যাবে, আর যদি নিজের স্বার্থ অর্জনের জন্য অবৈধ উপার্জনের উৎস গুলি দখলে কৌশলী হই তাহলে দেশ আবারও দূর্নীতিতে বিশ্বের কাছে পরিচিতি লাভ করবে। আজকাল রাজনীতি মেধাগুন্য ও শ্লোগান সর্বস্ব হয়ে পড়েছে। রাজনীতিতে বুদ্ধি বিবেকহীন মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে।
শিক্ষা জীবন থেকে ঝরে যাওয়া কিংবা কিশোর যৌবনেই মাদকের ছোবলে নীতিহীন ও সন্ত্রাসী কাজে জড়িয়ে পড়ে। তারা নেতাদের পদ লেহন করে সমাজে টিকে থাকার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে। এদের কোন সুখ্যাতি নেই, সুচিন্তা ও কর্মশক্তি নেই, অন্যের মঙ্গল কামনার ইচ্ছাও নেই।
ব্যক্তিস্বার্থ ও দূর্নীতির মাধ্যমে জাতীয় সম্পদ ধ্বংস ও লুটপাট করে, ব্যক্তিগত সম্পদের পাহাড় গড়ার আপ্রান চেষ্টা। বর্তমান রাজনীতি করলেই বড় লোক অর্থাৎ ধনী হওয়া যায়। নেতা হলেই অবৈধভাবে ঘুষ খাওয়া যায়। ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে। পরিবারে সুখ স্বাচ্ছন্দ আসে। আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হওয়া যায়।

এত সহজে ভাগ্য গঠনের দ্বিতীয় কোন পথ খোলা নেই। অনেকে রাজনীতি মানেই ডিগবাজী খেলা মনে করে। তাদের কোন আদর্শ বা নীতিবোধ নেই। যে কোনভাবে ক্ষমতা দখল করতে পারলেই হলো। সন্ত্রাসী ও পেশীশক্তি লালন করে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য অনেক কুটকৌশল দেখা যায়। ঘুষ, দূর্নীতি, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজীর পথ ধরে তারা নিজের প্রতিষ্ঠা অর্জন করছে। বর্তমানে নীতিহীন কাজে জড়িত হয়েও সমাজে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে। তারাই সমাজপতি তাদের অঙ্গুলি নির্দেশে সমাজের মানুষকে চলতে হয়। তারা ইচ্ছা করলে সমাজকে ভাল পথে পরিচালিত করতে পারে। আবার খারাপ পথেও চালাতে পারে। ছোট ছোট অপরাধ ও অনাচারগুলো নিজেদের মানবিক ও নৈতিক গুনাবলি দিয়ে সমাধান করতে পারেন। সেক্ষেত্রে পক্ষপাত দুষ্ট অবস্থানের কারনে তা সম্ভব হচ্ছে না। বরং সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টি হচ্ছে। সাধারন গরীব দুঃখী মানুষের বিপদে আপদে নেতারা পাশে থাকে না। অর্থের বিনিময়ে অপরাধীদের পক্ষে অবস্থান নেয়। তাদের কাছে সততা ও নৈতিকতার কোন মূল্য নেই। দেশের বিচার ব্যবস্থা দলীয় করণ মুক্ত রাখতে হবে। বিচার ব্যবস্থা হচ্ছে একটি দেশের সর্বোচ্চ আদর্শ ও নৈতিক শক্তি প্রদর্শনের স্থান। বিচার বিভাগ রাজনৈতিক দলের প্রভাব মুক্ত থেকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নিয়ম নীতি ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েই আমাদের সমাজ ও দেশকে পরিচালনা করতে হবে। ঘুষ জালিয়াতির চলমান ধারাকে পরিহার করতে হবে। কেননা ঘুষ সত্যকে বদলিয়ে দেয়। পাশকে ফেইল দেখিয়ে দেয়। একজনের হক অন্যকে দিয়ে দেয়া হয়। পবিত্র আল কোরআনে আছে ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে শুনে সত্য গোপন করো না।’ জালজালিয়াতি ভেজাল ও সকল প্রকার দূর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান সৃষ্টি করতে হবে।
নতুন প্রজম্মের মাঝে সত্যবাদিতা, ধৈর্যশীলতার দৃষ্টান্ত রাখতে হবে। অনৈতিক আচরণ ও অভ্যাস গুলো পরিবর্তন করে নৈতিক জীবনবোধ গঠনের পথে এগুতে হবে। মহান সৃষ্টিকর্তা বলেন ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের ধন সম্পত্তির কিছু অংশ জেনে শুনে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকের কাছে পেশ করো না।’ সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য সম্পদ ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধির ধ্বংসাত্মক প্রতিযোগিতা থেকে সরে আসতে হবে। ধর্মীয় অনুশাসন মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের আমুল পরিবর্তন আনতে পারে। সেই কারনে সমাজে বিবেকবান মানুষের মধ্যে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করে পরিশুদ্ধ চিন্তা চেতনার বিকাশ ঘটিয়ে দেশকে দূর্নীতির অভিশাপ মুক্ত করতে হবে। সৎ সহনশীলতা, দেশ প্রেম লালন করেই নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
অন্যায় নীতিহীন, সমাজ বিরোধী কাজ থেকে দুরে থাকতে হবে।

এ প্রসঙ্গে ১১০০ খ্রিষ্টাব্দ ইমাম গাজ্জালী রচিত ‘রাজার জন্য উপদেশ’ গন্থে বলেন হে পৃথিবীর রাজা চারটি বিষয় অবশ্যই আপনার সঙ্গে রাখবেন। বিষয়গুলো ১. ন্যায়পরায়ন, ২. বুদ্ধিমত্তা, ৩. ধৈর্য্য, ৪. বিনয়। চারটি বিষয় অবশ্য অবশ্যই পরিহার করবেন। ১. হিংসা, ২. উগ্রতা, ৩. সংকির্ণতা, ৪. শত্রুতা।

এই মনীষি লেখক ইমাম গাজ্জালী তার রচনায় রাজা বা নেতাদেরকে যে উপদেশবানী দিয়েছেন, যেসব গুনাবলী লালন বা ধারন করতে বলেছেন তা বর্তমানে পরিত্যাজ্য। আর যে সকল বিষয় নিষেধ করেছেন, পরিহার করতে বলেছেন, সেগুলোই এখন নেতারা নিজেদের মধ্যে লালন ও ধারন করে সমাজ এমনকি দেশ পরিচালনা করছেন। এই বিপরীতমুখী অবস্থা থেকে আমাদের সরে আসতে হবে। ন্যায় বিচার, বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য বিনয় এইসব গুনাবলী অর্জন করতে হবে। কেননা রাজনৈতিক কর্মীর প্রাথমিক দায়িত্ব হলো জগগনের সেবা করা। জনসাধারনের মানবিক ও মৌলিক চাহিদাগুলো কিভাবে পুরণ করা যায় সে বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া, সামাজিক পরিবেশ দূষনমুক্ত করা, জন সচেতনতা বৃদ্ধি করে মানুষের উত্তম জীবন-যাপনের জন্য পথ নির্দেশনা তৈরী করা। যেহেতু মানব সেবার আদর্শ হলো রাজনৈতিক নেতার মূলভিত্তি। তারা সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবেন। সততা, বিনয়ী স্বভাব তাদের চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট্য। হিংসা বিদ্বেষ তাদের চলার পথকে কুলষিত করতে পারবে না। তারা হবেন উদার ও বৃহৎ মনের অন্যতম মানুষ। গরীব-ধনী, উচু-নিচু, ভেদাভেদ তাদের কাছে নেই। তাদের মধ্যে সংকির্ণতা, অহংবোধ, উগ্রতার কোন স্থান নেই। নেতৃবৃন্দ সৎ ন্যায় নিষ্ঠ, কঠোর পরিশ্রমী ও সাহসী বিধায় তাদের চলার গতিকে কেহ থামাতে পারে না। হিংসা বিদ্বেষ, দলাদলি, হানাহানি নেতিবাচক মনোভাব ও কর্মকান্ড থেকে দূরে থাকবেন, হবেন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। নেতারা লোভ লালসার উর্ধ্বে থেকে সমাজ পরিচালনায় রাখবেন বলিষ্ট ভুমিকা। উন্নত সমাজ প্রতিষ্ঠায় নির্মাতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবেন। অবৈধ ব্যবসা, টেন্ডারবাজী, কালোবাজারী, সমাজে বিশৃংখলার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন পরিহার করে পরিচ্ছন্ন জীবন ধারা সৃষ্টি করে আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে। নিজেদের আদর্শ কে সমুন্নত রাখতে হবে। দৃঢ়তা, আত্মসম্মান বোধ, দেশপ্রেম ও কলুষ মুক্ত জীবন গঠন করতে হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে অনুকরণীয় দৃটান্ত রাখাতে হবে। একজন রাজনেতিক নেতা হবেন সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব। উদ্ভাবনী শক্তি যার মাধ্যমে আমাদের সমাজে বৈষয়িক অস্তিত্ত্ব ও জাতীয় কল্যান নির্ভর করে। সমাজ, আইন, সরকার, শিক্ষা, কৃষি, বাজার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে হবে। সমাজ ব্যবস্থার সকল ক্ষেত্রে যেমন নাগরিকদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, বাজার ব্যবস্থাপনার উৎকর্ষ ও সৃজনশীল উদ্ভাবনের জন্য রাজনীতিবিদদের গবেষনা জ্ঞান অর্জন করতে হবে। সৎ সাহসী, নিষ্ঠাবান দেশপ্রেমিক নাগরিক রূপান্তরে কার্যকর ভুমিকা পালন করতে হবে।

অশুভ অনৈতিক অগ্রযাত্রা পরিহার করে “সততাই সর্বোত্তম নীতি” এই মূলমন্ত্রে বিশ্বাসী হয়ে নেতৃত্ব বিকাশে সমাজ পরিচালনায় সঠিক দায়িত্ব পালন করা। সমাজ ও দেশ পরিচালনায় নিজেকে পারদর্শী ও যোগ্যতার নজির স্থাপন করতে হবে। সকল প্রকার অবৈধ কর্মকান্ড হতে নিজেকে নিরাপদে রাখতে হবে। সৎ চরিত্রবান হিসেবে নিজেকে গঠন করে একজন প্রকৃত সমাজ সেবক মর্মে এলাকায় বসবাসকারী সবার আস্থা অর্জন করতে হবে। সহজ সরল মানুষগুলো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে সংস্পর্শে আসতে নিরাপদ মনে করেন না, কেননা নেতারা প্রায়ই অন্যায় ও অপরাধ মূলক কাজের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে দেখা যায়। লোভের কারনে মানুষ মানুষকে হত্যা করে। তাই বৈধ উপায়ে প্রয়োজন মাফিক সম্পদ ও সম্মান অর্জন করা উচিৎ।

বর্তমানে রাজনীতি করলেই কালো টাকা অর্জনের পথ খুলে যায় এবং কালো টাকা সাদা করতেও কোন অসুবিধা নেই। ইদানিং সরকারী মদদেই কালো টাকা সাদা করা হচ্ছে। সরকারে াথাকলে অবৈধ পন্থায় সম্পদ অর্জন ও বৈধতা অতি সহজ ব্যপার, স্বীকৃতি মিলতে কোন বেগ পেতে হয় না। একটু কৌশলী হলেই ব্যাংক ও সরকারী অর্থের উৎস গুলিকে অনৈতিক ভাবে ব্যক্তিগত ব্যবসায় ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে। হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়ে বিলাস বহুল বাড়ী গাড়ী অর্জনের স্বপ্ন বিনাশ্রমে স্বল্প সময়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে। নামীদামী কলকারকার মালিক হচ্ছে। অথচ খেটে খাওয়া গার্মেন্টস কর্মীদের মুজুরী বৃদ্ধিতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাথা ব্যথা নেই। হাজার হাজার গার্মেন্টস শ্রমিকরা ঢাকার বস্তিতে স্বপরিবারে শিশু কিশোরদের নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করে। তাদের সন্তানদের শিক্ষা ও চিকিৎসার কোন সুব্যবস্থা নেই। জীবন যুদ্ধে ঐ সকল শ্রমজীবি মানুষেরা বড়ই অসহায়।

আমাদের সংবিধান আছে “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে, পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদন শক্তির ক্রম বৃদ্ধি সাধন এবং জনগনের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিকগত মানের দৃঢ় উন্নতি সাধন যাহাতে নাগরিকদের জন্য অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, চিকিৎসা সহ মৌলিক উপকরনে ব্যবস্থা করা হয।

কিন্তু নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তারা তাদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত। তারা তো নিজেদের চিকিৎসা ও কেনা কাটা’র জন্য বিদেশে ভ্রমন করছেন। বাড়ী, গাড়ী, বিত্ত, বৈভব, প্রভাব প্রতিপত্তি লাভের তীব্র আকাংখা নিমিশেই বাস্তবায়িত করছেন। দেশবাসী ও সচেতন মানুষেরা সবাই ভালভাবে অবগত আছেন যে, জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচনের সময় ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে দেয়া প্রতিশ্রুতি আর নির্বাচনী বৈতরনী পার হওয়ার পর তাদের কর্মকান্ড আকাশ-পাতাল গড়মিল। নির্বাচনকালিন সময়ে তাদেরকে সাধারণ মানুষের সাথে সুন্দর আচরন, গরীব-দুঃখী সাধারন মানুষগুলোকে অনেক আশা ও স্বপ্ন দেখিয়ে ভোট নেয়। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা কি দেখি। জন প্রতিনিধিরা গরীব দুখীদের খোজ খবরই রাখে না। ভোটের আগে অতি দরিদ্র খেটে খাওয়া মেহনতি গরীব অসহায় মানুষগুলির সাথে অতি সাধারন ব্যবহার করতে পারলেই বাজিমত। রোগীর খোজ-খবর নিতে হাসপাতালে যাওয়া, মামলা মোকদ্দমায় কোট কাচারীতে গিয়ে সহ মর্মিতা দেখাতে পারলেই নেতা হওয়ার পথ খুলে যায়।
দারিদ্রতার সুযোগে একটু পরিকল্পিত সহানুভুতিই হতে পারে সারা জীবনের উন্œতির সিঁড়ি, এসব গুনের অধিকারী নেতা ব্যক্তিরাই মোষ্ট পপুলার, মানুষ তাদেরকে সমর্থন করে, প্রশস্ত হয় নেতৃত্বের পথ। মঞ্চে উঠে মন ভুলানো, রসালো বক্তৃতা, কথায় কথায় গরীব দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর প্রতিশ্রুতি, কল্যান সাধনের নিশ্চয়তা এমন প্রলোভন দিয়ে ভোটে বিজয়ী হলে আর কে পায় তাকে। ঘুরে যাবে ভাগ্যের চাকা, ফিরে যাবে পারিবারিক জৌলুস, ধন দৌলত বৃদ্ধির দূর্বার গতি আকাশ কে স্পর্শ করবে। নামে বেনামে কেনা হবে জমি, তৈরী হবে বাড়ী, মার্কেট, কল-কারখানা, হতে পারে দেশে কিংবা বিদেশে। নিজের ভাগ্য পরিবর্তনে লুকায়িত ব্যক্তিস্বার্থ ও লোলুপতা জাগ্রত হবে। ভুলে যাবে তার প্রতিশ্রুতি, তার অতীত চেতনা, মনেই থাকবে না জাতীর আশা আকাংখার কথা। দেশপ্রেম, জনসেবা, মানুষের মৌলিক অধিকার, গনতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মুক্তির কথা। অথচ এগুলিই হলো স্বাধীনতার মূল চেতনা। স্বাধীনতার পূর্বে যেগুলো হরণ করেছিল হানাদার পাকিস্তানী শাসকেরা। পাকিস্তানীরা এদেশের সম্পদ লুন্ঠন করেছে, চালিয়েছিল রাষ্ট্রিয় শোষন। এখন যারা ক্ষমতার মসনদে বসে তারাই শোষনের হাতকে শক্তিশালী করে।

ক্ষমতায় যাওয়া জন্য কুটকৌশল অবলম্বন করে, দলবাজী, গলাবাজী, অন্য দলের কুটসা রটানো, গালাগালি নিষ্ফল বাক্য ব্যয় করা। বিরোধী দলও সহযোগিতা করা তো দুরের কথা কিভাবে সরকারকে পরাস্থ করা যাবে তা নিয়ে সব সময় ব্যস্ত থাকে। একে অপরকে দমন-পীড়ন করতে যথা সাধ্য যা যা করা দরকার তাই করে, অন্যের জান মালের ক্ষতি সাধন করেও নিজের স্বার্থ হাসিল ও সংরক্ষনের চেষ্টা করে। দলীয় নেতা কর্মীদের গুম-খুন-হত্যা করতেও কুন্ঠাবোধ করে না। সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজির কারনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে মারামারি-কাটাকাটি, হানাহানি, হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। দেশে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করে। দলের মধ্যে সৌহার্দ সম্প্রীতি ও ভালবাসার সম্পর্ক থাকে না।

ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি জনগনের বিশ্বাস ও আস্থা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। চলমান রাজনীতির উপর মানুষের ঘৃনা জম্মায়। মানুষের জীবন দূর্বীসহ হয়ে উঠে। যদি অন্যায়কারীরা নেতৃত্ব পায় তবে সমাজে শান্তি শৃংখলার আশাও করা যায় না। জাতীয় সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ সুবিধা সুযোগ সন্ধানী অপরাধ প্রবন মানুষের মাঝেই বন্টিত হয়। যেহেতু তারাই সমাজ ও রাজনীতি নিয়ন্ত্রন করে। সিংহভাগ গরীব অসহায় মানুষগুলো সারা জীবন আশায় আশায় বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে তাদের মধ্যে চরম হতাশা ও হাহাকার বিরাজ করে।

লেখকঃ মোঃ আবু সামা মিঞা ঠান্ডু
সহকারী অধ্যাপক ও
সাধারণ সম্পাদক
উপজেলা দূর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি
বীরগঞ্জ, দিনাজপুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.