প্রচ্ছদ > মতামত > শিক্ষক নিবন্ধনেের সনদে ৩৫-এ বাঁধা কেন?

শিক্ষক নিবন্ধনেের সনদে ৩৫-এ বাঁধা কেন?

ভূপেন্দ্রনাথ রায়: বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের উদ্দেশ্যে শিক্ষামন্ত্রনালয় গত ১২ জুন এমপিও নীতিমালা-২০১৮ প্রকাশ করেছে। নীতিমালার ১১.৬ ধারায় এন্ট্রি লেভেলে শিক্ষক নিয়োগের বয়স ৩৫ বছর করা হয়। এই নীতিমালার আলোকে বাংলাদেশের সমস্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ করার কথা বলা হয়। বিডি জার্নাল, বিডি টাইমস৩৬৫ সহ কয়েকটি অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে পাওয়া খবরে জানা যায় ৩৫ কিংবা তদুর্ধ বয়সি নিবন্ধন সনদ প্রাপ্তরা এনটিএরসিএ’র গণবিজ্ঞপ্তিতে আবেদন করার যোগ্য বিবেচিত হবে না। এ বিষয়ে নিবন্ধনধারীরা এনটিআরসিএ কার্যালয়ে ৩৫ বছর নির্ধারণ সম্পর্কে তথ্য জানতে চাইলে এনটিআরসিএ’র কর্মকর্তারা সবার জন্য পয়ত্রিশ বলে নিশ্চিত করেন ।
কিন্তু মহামান্য হাইকোর্ট গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর প্রায় দুই শতাধিক দায়েরকৃত মামলার মধ্যে ১৬৬ টি রীটের চুড়ান্ত রায়ে নিবন্ধনপ্রাপ্তদের নিয়োগের আদেশ প্রদান করে। রায়ের ১ নং পয়েন্টে অনুসারে সনদধারীদের নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত সনদের মেয়াদ আজীবন করার কথা বলা হয়েছে। একইভাবে রায়ের ৫ নং পয়েন্টে এনটিআরসিএ’কে রীট পিটিশনার এবং প্রত্যাশিত আবেদনকারিদের নাম জাতীয় মেধা তালিকার ভিত্তিতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান শূন্যপদে সুপারিশ করার নির্দেশ প্রদান করা হয়। মহামান্য হাইকোর্ট রায় দেয়ার পর নব্বই দিনের মধ্যে বাস্তবায়ন করার কথা থাকলেও এনটিআরসিএ ই-রিকুইজিশনের নামে বারবার কালক্ষেপন করে যায়। এদিকে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগে এতদিন কোন বাধাধরা বয়স না থাকলেও মহামান্য হাইকোর্ট তার রায়ের সাত নম্বর ব্যাখ্যায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের উদ্দেশ্যে আবেদনকারিদের বয়সসীমা নির্ধারণ করার অবিলম্বে একটি উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়া উচিৎ মর্মে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রনালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এন্ট্রি লেভেলে শিক্ষক নিয়োগের বয়স সর্বোচ্চ পয়ত্রিশ করে। নীতিমালায় আরো বলা হয় ৩৫ বছরের পরে কেউ এমপিও ভুক্তির যোগ্য বিবেচিত হবে না। রায়ে মহামান্য হাইকোর্ট এন্ট্রি প্রসেসে শিক্ষক নিয়োগের বয়স নির্ধারণ করার কথা বলে। এন্ট্রি প্রসেস বলতে এখানে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের উদ্দেশ্যে এনটিআরসিএ কতৃক আয়োজিত সনদ অর্জনের পরীক্ষায় অংশগ্রহন করার বয়স বোঝায়।
কোন নীতিমালা কিংবা আইন করার পূর্বে আইনটির কুপ্রভাব কিংবা ভালো-মন্দ দিক যাচাই-বাছাই এবং জনসাধারণের কাছে সুস্পষ্ট এবং বোধগম্য করা দরকার। প্রণীত আইনে ভুক্তভোগী কেউ হয়রানি যেন না হয় সেটাও লক্ষ্য রাখা হয়। পরীক্ষায় পাসের কোন সনদ বয়সের মাপকাঠিতে আবদ্ধ থাকার কথা নয়। তাহলে শিক্ষামন্ত্রনালয় এবং এনটিআরসিএ কিভাবে নিবন্ধন সনদপ্রাপ্তদের বয়সের সীমাবদ্ধতায় নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করে তা পয়ত্রিশ এবং পয়ত্রিশোর্ধ নিবন্ধনধারীরা জানতে চায়।
এদিকে ১ থেকে ১৩তম অনেক নিবন্ধন সনদধারীর বয়স ৩৫ কিংবা ৩৫ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক চুড়ান্তভাবে সম্পন্ন হওয়া ১৪তম নিবন্ধন প্রার্থীদেরও অনেকের বয়স পয়ত্রিশ পার হয়েছে। তাহলে কি তারা পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়া সত্বেও বয়সের সীমাবদ্ধতায় আটকে যাবেন? নাকি তাদের বয়সের কারণে বাদ দেয়া হবে? প্রশ্নটি শিক্ষাসচিব মহোদয়সহ এমপিও নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির কাছে। পরীক্ষায় অবতীর্ণ অবস্থায় বয়সের সীমা তারা মুখ বুজে সহ্য করবে এই ভাবনা বোকামি ছাড়া কিছু হতে পারে না। যদি তাদেরকে বঞ্চিত করা হয় তাহলে তারা আদালতে যেতে পারে। এমনিতেই ১-১২ তম নিবন্ধন সনদধারীরা মহামান্য আদালতের রায় নিয়ে নিয়োগের প্রহর গুণছে এবং প্রায় অর্ধেক নিবন্ধন সনদধারী যাদের বয়স ইতিমধ্যে ৩৫ পেরিয়ে গেছে তাদের চার-পাঁচটি গ্রুপ আদালতের দ্বারস্থ হতে প্রস্তুত হয়ে আছে। যে মুহুর্তে তারা প্রজ্ঞাপনে ৩৫ বছর দেখবে সেই মূহুর্তে এনটিআরসিএ’র বিরুদ্ধে কনটেম্প মামলা করবে বলে জানিয়েছেন দিনাজপুরের নাজমুল হক, ঢাকার আমজাদ হেসেন, গাইবান্ধার তিতুমির সহ অনেকে। বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধিত নিয়োগ বঞ্চিত জাতীয় ঐক্য পরিষদের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম জানান, ‘প্রায় তিন-চারশো পয়ত্রিশোর্ধ নিবন্ধনধারী অন্তর্ভুক্ত হয়ে আমাকে কনটেম্প মামলা করতে বলছে। এনটিআরসিএ প্রদত্ত প্রজ্ঞাপনে মহামান্য হাইকোর্টের রায়ের কোন কমতি থাকলেই শুধু কনটেম্প করা হবে।
এজন্য আমি তাদের গণবিজ্ঞপ্তি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলছি।’ এছাড়া মিজানুর রহমান জীবনসহ অনেক রীট নেতৃবৃন্দ পয়ত্রিশ-পয়ত্রিশোর্ধ সনদধারীদের কনটেম্প মামলা করার জন্য সংগঠিত করছেন। এনটিআরসিএ যদি বয়স উল্লেখ করে গণবিজ্ঞপ্তি দেয়, তাহলে এবারও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে অস্থিরতার সৃষ্টি হবে যা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না। কারন পয়ত্রিশ-পয়ত্রিশোর্ধ সনদধারী এবং মহামান্য হাইকোর্টের চুড়ান্ত রায় পাওয়া রীট পিটিশনারগন মহামান্য আদালতকে বুঝাতে সক্ষম হবেন যে, রায়ে সনদের মেয়াদ (আজীবন) চাকুরি না হওয়া পর্যন্ত থাকলেও কেন তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে? এতে শিক্ষক নিয়োগ আরো দুই-তিন বছরের জন্য পিছিয়ে যেতে পারে এবং বেকার সমস্যা বৃদ্ধিসহ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক স্বল্পতার নাজুক অবস্থার সৃষ্টি হবে। বিষয়টি স্পর্শকাতর বিধায় বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি সহ উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহন করা অতি আবশ্যক।
লেখক: ভূপেন্দ্র নাথ রায়,
অধ্যক্ষ, সাইডীরিয়্যাল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ, খানসামা, দিনাজপুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.