প্রচ্ছদ > সারাদেশ > উদ্বোধনের আগেই ধ্বসে পড়ছে দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুর সংযোগ সড়ক

উদ্বোধনের আগেই ধ্বসে পড়ছে দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুর সংযোগ সড়ক


জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট : নির্মান ব্যায় তিন গুণ বৃদ্ধি করেও উদ্বোধনের আগেই ধ্বসে পড়েছে লালমনিরহাটের দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুর সংযোগ সড়ক ও ব্রীজ। কাজের মান নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের শেষ নেই। দায় এড়াতে দু দু’বার সংস্কার করেও রক্ষা করতে পারছেন না স্থানীয় সরকারের প্রকৌশল দফতর।
জানা গেছে, যোগাযোগ ব্যবস্থা অধিকতর উন্নয়ন ও ব্যবসা- বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে আর্ন্তজাতিক ব্যবসায়ীক রুট বুড়িমারী স্থলবন্দরের সাথে রাজধানী ঢাকা ও বিভাগীয় শহর রংপুরের দুরত্ব কমিয়ে আনতে তিস্তা নদীর উপর ‘ কাকিনা-মহিপুর’ ঘাটে দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুর নির্মানের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের রুদ্বেশ্বর ও রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষীটারী ইউনিয়নের মহিপুর এলাকায় তিস্তা নদীর উপর ২০১২ সালে ১২ এপ্রিল এ সেতুর নির্মান কাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এ সেতু বাস্তবায়নের দায়িত্ব পান লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশল দফতর। ২০১৪ সালের ৩১ জুন নির্মান কাজ শেষ করার প্রতিশ্রæতি দিলেও দ্বিতীয় দফায় সময় বাড়িয়ে ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর সেতুর নির্মান কাজ শেষ করেন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স নাভানা কন্সট্রাকশন। এরই মধ্যে সেতুর কাজ বুঝে নিয়েছেন বাস্তবায়নকারী কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশল দফতর।
কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, ১২৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ৮৫০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ফুটপাতসহ ৯ দশমিক ৬ মিটার প্রস্থের দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুতে ১৬টি পিলার, ২টি এপার্টমেন্ট, ১৭টি স্প্যানে ৮৫টি গার্ডারের উপর সেতুটির নির্মিত। একই অর্থে সেতুটি রক্ষার জন্য উভয় পার্শে¦ ১৩০০ মিটার নদী শাসন বাঁধ নির্মান করা হয়েছে। সেতুর সাথে লালমনিরহাট বুড়িমারী মহাসড়কের কাকিনা থেকে সেতু পর্যন্ত ৫.২৮০ কিলোমিটার সড়ক নির্মানে দুইটি প্যাকেজে ৪ কোটি ৪৬ লাখ এবং এ সড়কে ২টি ব্রীজ ও তিনটি কালভার্ট নির্মানে ৩টি প্যাকেজে ৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যায় হয়। সেতু থেকে রংপুরের অংশে ৫৬৩ মিটার সড়ক নির্মানে ব্যায় হয় এক কোটি ৪২ লাখ টাকা।
সেতুর নির্মান কাজ শেষ না হতেই ৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। ফলে দুর্নীতি ঢাকতে ওই সড়ক বর্ধিত করনের নামে দুইটি প্যাকেজে ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যায় দেখানো হয়। সড়কটি প্রস্থ্যে ১২ থেকে ১৮ ফিট হলেও নিম্নমানের কাজের কারনে আবারো চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। ফলে তৃতীয় দফায় আবারো ৫ কিঃমিঃ এ সড়কটি শক্তিশালী করনের নামে বরাদ্ধ দেয়া হয় ৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। সড়ক নির্মানে প্রতি কিলোমিটারে এক কোটি টাকা ব্যায় ধরা হলেও এ সড়কে তিনগুণ অর্থ বেশী খরচ করেও কাজে আসছে না। এ ৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মানে তিন দফায় মোট ১৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যায় করা হলেও উদ্বোধনের আগেই ধ্বসে যেতে শুরু করেছে।
স্থানীয়রা ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, ৫ কিঃমিঃ সংযোগ সড়কে দুই ফিট এটেল মাটি দেয়ার কথা থাকলেও শুধু বালুর উপর খোয়া দিয়ে দায়সাড়া কাজ করায় ধ্বসে যাচ্ছে সড়ক। ব্যবহৃত খোয়ার গুনগত মান নিয়ে অভিযোগ করেও সুফল পাননি স্থানীয়রা। ব্রীজ ও কালভার্ট নির্মানেও ব্যাপক অনিয়ম থাকলেও টাকার জোরে স্থানীয় প্রকৌশলীরা সব কিছু যায়েজ করে নিয়েছেন বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।
নি¤œমানের কাজ ঢাকতে তিন দফায় সংস্কার করেও চলাচলের উপযোগি করতে পারছেন প্রকৌশল দফতর। এরই মাঝে দুইটি ব্রীজ ও দুইটি কালভার্টের মোকা ধ্বসে পড়েছে। যা জিও ব্যাগ ফেলে আটকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করা হচ্ছে। ভেঙ্গে যেতে শুরু করেছে মুল সড়কটি।
নদী শাসনের ১৩শত মিটার বাঁধ অপরিকল্পিত ভাবে নির্মান করায় নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। তিস্তার মুল ¯্রােত ধারা সেতু হয়ে না গিয়ে লোকালয় ভেঙ্গে এ ৫কিলোমিটার সংযোগ সড়ক ও ব্রীজ কালভার্ট ভেঙ্গে যেতে বসেছে। হুমকীর মুখে পড়েছে এ সড়কসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বসত বাড়ি ও হাট বাজার। এ সড়কটি ভেঙ্গে গেলে তিস্তা দ্বিতীয় সড়ক সেতুটি কোন কাজেই আসবে না বলে স্থানীয়রা স্বংশ্বয় প্রকাশ করেছেন।
এ দিকে নিজের দায় এড়াতে সুকৌশলে সেতু ও সড়কটি স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল দফতর রংপুরের কাছে বুঝে দিয়েছেন কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী পারভেজ নেওয়াজ খান। এই একটি মাত্র প্রকল্পে আংগুল ফুলে কলাগাছে পরিনত হয়েছেন তিনি। ২০১১ সাল থেকে কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ঊর্দ্ধতন মহলকে মোটা অংকে ম্যানেজ করে বদলি ঠেকিয়ে আসছেন এ প্রকৌশলী। সরকারী বিধিমতে প্রতি তিন বছর পর কর্মস্থল থেকে বদলি নেয়ার কথা থাকলেও এ প্রকৌশলীর নামটাই যেন ভুলে গেছেন কর্তৃপক্ষ এমনটাই দাবি স্থানীয়দের।
এ সেতুর নিয়মিত যাত্রী মুন্না, আজিজুল, শিপন ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, নাম মাত্র কাজ দেখিয়ে এ প্রকল্পের অর্থে ঠিকাদার দলীয় নেতাকর্মী ও প্রকৌশলীদের পকেট ভারি হয়েছে। এজন্য উদ্বোধন হওয়ার আগেই চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বালুর রাস্তায় সিসি ক্লোক যেখানে ধ্বসে পড়েছে সেখানে জিও ব্যাগে কি ভাবে রক্ষা পাবে? প্রশ্ন তুলেন তারা। ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী পারভেজ নেওয়াজ খান ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, নদী প্রতিমুহুর্তে তার গতিপথ পরিবর্তন করে থাকে। সেতু নির্মানের পরিকল্পনা সময়ের গতিপথ অনুযায়ী সেতু ও নদী শাসন বাঁধ নির্মান করা হয়েছে। এখন কোন ভাবে নদী গতিপথ পরিবর্তন করেছে। যা পর্যালোচনা ও ব্যবস্থা নেয়া তার কাজ নয়। সেটা দেখবেন পানি উন্নয়ন বোর্ড। সড়কের ক্ষতিগ্রস্থ অংশে কাজ করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের আগেই কাজ শেষ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.